
কুমিল্লার বরুড়া উপজেলার পয়ালগাছা ইউনিয়নের নারায়ণপুর ও বটতলী এলাকার ঐতিহাসিক সম্মুখ যুদ্ধ দিবস আজ। ১৯৭১ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর পাক হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে শাহাদাৎ বরণ করেন ৫ জন বীর মুক্তিযোদ্ধা।
ঐতিহাসিক এই দিবস উপলক্ষে আজ উপজেলা প্রশাসন, বীর মুক্তিযোদ্ধা ও তাঁদের পরিবারের সন্তানরা শহীদদের স্মৃতিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ ও দোয়ার আয়োজন করেন। অনুষ্ঠানে প্রশাসনের পক্ষে উপস্থিত ছিলেন বরুড়া উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) আহসান হাফিজ।
১৯৭১ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর পাক হানাদার বাহিনী রাজাকার ও আলবদর দোসরদের বিশাল বহর নিয়ে নারায়ণপুর ও বটতলী এলাকায় অনুপ্রবেশ করে। খবর পাওয়া মাত্রই কোনো বিলম্ব না করে অদম্য সাহসে পাল্টা আক্রমণ চালান স্থানীয় বীর মুক্তিযোদ্ধারা।
অত্যাধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত হানাদারদের বিরুদ্ধে চতুর্দিক থেকে প্রবল প্রতিরোধ গড়ে তোলা হয়। মুক্তিযোদ্ধাদের তীব্র আক্রমণের মুখে টিকতে না পেরে আধুনিক অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত পাক বাহিনী এলাকা ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়। তবে পরাজয়ের প্রতিশোধ নিতে পালিয়ে যাওয়ার সময় শত্রু দল পুরো গ্রামে আগুন লাগিয়ে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করে।
সম্মুখযুদ্ধে শত্রুর বুলেটের সামনে অকাতরে প্রাণ বিসর্জন দেন বরুড়ার ৫ বীর সন্তান: শহীদ মমতাজ উদ্দিন (গ্রাম: আড্ডা, ইউনিয়ন: আড্ডা), শহীদ সিরাজুল ইসলাম (গ্রাম: দীগলিয়া, ইউনিয়ন: আড্ডা), শহীদ কাজী আরিফ বাবলু (গ্রাম: ধুগুই, ইউনিয়ন: পয়ালগাছা), শহীদ জয়নাল আবেদীন (গ্রাম: কাকৈরতলা, ইউনিয়ন: আদ্রা), শহীদ সিরাজুল ইসলাম (গ্রাম: সিঙ্গুরিয়া, ইউনিয়ন: লক্ষীপুর), যুদ্ধের পর একই মাটিতে লড়াই করা এই পাঁচ শহীদকে নারায়ণপুরের মাটিতেই সশ্রদ্ধচিত্তে একই কবরে সমাহিত করা হয়। সে সময় বিবিসি (BBC)-সহ আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও ভারতীয় পত্রপত্রিকায় এই যুদ্ধের বীরত্বগাথা গুরুত্বের সাথে প্রকাশিত হয়েছিল।
তৎকালীন সময়ে এই সম্মুখ যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী পয়ালগাছা ইউনিয়নের বীর মুক্তিযোদ্ধা মরহুম মানোয়ার আলী আখন্দের বিবরণ অনুযায়ী জানা যায়, যুদ্ধের একপর্যায়ে বীর মুক্তিযোদ্ধা সিরাজুল ইসলামকে জীবিত বন্দি করে ফেলে পিশাচ পাকিস্তানি সেনারা।
বন্দি সিরাজুলকে মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে শর্ত দেওয়া হয়—‘পাকিস্তান জিন্দাবাদ’ স্লোগান দিলে প্রাণভিক্ষা মিলবে। কিন্তু মাতৃভূমির প্রতি অটল এই বীর চরম মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েও বারবার গর্জে ওঠেন ‘জয় বাংলা’ স্লোগানে। প্রলোভন ও ভয়ে দমাতে না পেরে ক্ষুব্ধ ঘাতকরা তাঁকে লক্ষ্য করে নির্বিচারে ব্রাশফায়ার করে। রক্তে ভেসে যায় বটতলীর মাটি, কিন্তু জয়ী হয় একজন বীরের অবিনাশী আদর্শ।
নারায়ণপুরের এই গণকবর ও ৫ বীর শহীদের এই আত্মত্যাগ স্বাধীন বাংলাদেশের রক্তভেজা ইতিহাসে এক চিরভাস্বর ও অক্ষয় দলিল হয়ে থাকবে।

মোঃ সবুজ হোসেন 















